| ২ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম:

মেশকাতুন নাহার’র কবিতাগুচ্ছ

মেশকাতুন নাহার’র কবিতাগুচ্ছ

১.

কেমন আছো বাংলাদেশ?

 

কেমন আছো বাংলাদেশ?

ঘামে ভেজা মাঠের ধুলো মাখা মুখে,

আজও কি লুকিয়ে থাকে স্বপ্নের হাসি?

নাকি হিসাবের খাতায় চাপা পড়ে

দীর্ঘশ্বাসের ফাঁসি?

 

কেমন আছো বাংলাদেশ?

উন্নয়নের আলো জ্বলে কোণে কোণে রাজপথে,

কিন্তু গলির অন্ধকারে দারিদ্রতার অভিশাপ,

আকাশ ছোঁয়া ভবনের ছায়ায়

ক্ষুধা দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।

 

কেমন আছো বাংলাদেশ?

তোমার সন্তানেরা আজ প্রশ্ন করে—

ন্যায় কি কেবল বইয়ের পাতায়?

মানবতা কি পোস্টারের ভাষা?

আর স্বাধীনতা—

সে কি এখনো সাহসের উচ্চারণ?

 

কেমন আছো বাংলাদেশ?

মা আজও নিরাপত্তা খোঁজে সন্তানের জন্য,

বোন আজও হাঁটে চোখে শঙ্কার ছায়া নিয়ে।

তবু অবাক লাগে—

এই দেশেই আবার

প্রতিবাদ জন্ম নেয়, আশার গান জাগে।

 

কেমন আছো বাংলাদেশ?

তোমার তরুণেরা স্বপ্ন বুনে

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের তাঁতে।

কেউ দেশ গড়ার কথা ভাবে,

কেউ দেশ ছাড়ার টিকিট।

চুয়ান্ন বছর বয়সে এই বুঝি তোমার সার্টিফিকেট?

 

কেমন আছো বাংলাদেশ?

তোমার ইতিহাস আজও বলে—

তুমি মাথা নত করো না।

রক্তের দামে কেনা পতাকা

আজও শেখায়

অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে।

 

শোনো বাংলাদেশ,

আমরা এখনো আছি—

প্রশ্ন নিয়ে, প্রতিবাদ নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে।

আমরা চাই—

তুমি আবার এমন হও,

যেখানে ন্যায় হবে অভ্যাস,

মানবতা হবে শক্তি,

আর শান্তি—সে শুধু স্বপ্ন নয়,

হবেই একদিন বাস্তবতার পুষ্পবিন্যাস।

 

২.

প্রশ্নবিদ্ধ সত্য 

 

মিথ্যার কারবার করছে ছারখার রাষ্ট্রের অলিগলি,

মিথ্যার রাজা ঘিয়ে ভাজা সত্য পথের ধূলি।

শক্তির ছায়ায় মিথ্যা হাসে,আইনের চোখে ফাঁকি,

সত্য দাঁড়ায় লাইনের শেষে,হিসাব কষে বাকি।

 

ফেসবুক-ভাষণ বর্ণিল ভূষণ,বিক্রি হয় রে–নীতি,

অনলাইনে গাইডলাইন,অফলাইনে রাজনীতি।

চাটুকারে অন্ধকারে গড়ে তুলছে গদি,

সত্য বললে কারাদণ্ড,মিথ্যুকের আজাদী।

 

সংবাদ সাজে ছলের খাঁজে,রঙিলা বিজ্ঞাপন,

শ্রমিকের ঘাম স্বপ্নের দাম, লুটে নেয় কিছু জন।

ধর্মের নামে সওদা জমে মানবতা হলো খুন,

নিরীহ চোখ বন্ধ মুখ,বুকে জ্বলে আগুন।

 

আঁধার ছুঁড়ে পাঁজর ফুঁড়ে জাগছে কিছু কণ্ঠ,

ঠিক সময়ে বর্জ্য পুড়ে দূর করবে সব গন্ধ।

সেই না আশায় জীবদ্দশায়,চেয়ে আছি নীরব,

সত্যের জয়ে শির উঁচিয়ে লোকের হবে কলরব।

 

৩.

রাক্ষুসী স্রোতের উপাখ্যান 

 

নদী—

ওই যে এক নদী, দেখছো?

অহংকারে উদ্ধত, উন্মত্ততায় অন্ধ,

স্বভাবেই সে দুর্মতি।

তারই তটরেখা ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে

শৈশবের আদ্যন্ত কাল থেকে

আমি তাকে দেখে এসেছি।

 

সেই প্রথম থেকেই সে

তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, সর্বগ্রাসী—

অগণিত জীবন সে গিলে নিয়েছে,

হিসেব রাখেনি কোনো জনপদ।

 

দেখেছি—

এই রাক্ষুসী নদীর গর্ভে

জন্ম নিয়েছে কত হাঙর, কত সর্প,

বিষধর বিচ্ছু আর দংশনমুখর কীট;

বুলেট পিঁপড়া, সিসি ফ্লাই,

কচ্ছপ, কুমির, অজগর—

ভয়ার্ত এক অন্য জগৎ।

 

নিজ বুকেই সে নির্মাণ করেছিল

এক আরশিনগর।

সবই দেখেছি আমি—

ভীত, অসহায়, বাকরুদ্ধ,

একাকী এক বালুচর।

 

দেখেছি নদীর সর্বনাশা খেলায়

ধসে পড়েছে কত সুখের ঘর,

দেখেছি পুত্রহারা পিতার

নীরব আর্তনাদ

নির্মম স্রোতের অভিঘাতে।

 

লাগামহীন উত্তাল ঢেউয়ে

ভেঙে গেছে অগণিত স্বপ্ন,

কচি জীবন গিলেছে

সংরক্ষিত হাঙরের দল—

সবই তো চাক্ষুষ দেখেছি।

 

যখন প্রকাণ্ড সাইক্লোন

দুর্বার বেগে গ্রাস করেছে উপত্যকা,

দেখেছি তার তাণ্ডবলীলায়

কাঁপতে থাকা উপকূল,

দেখেছি নিঃস্ব মানুষের

নিঃশব্দ শঙ্কা।

 

চৈত্রের দগ্ধ উত্তাপে দেখেছি

তার শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর,

যৌবন নিঃশেষে

সে আজ কতটাই না অনুর্বর।

 

অমাবস্যার অন্ধকারে

চন্দ্রালোক যখন স্পর্শ করে না তার দেহ,

কতটা কদর্য হয়ে ওঠে তার রূপ-

সবই দেখেছি আমি,

দেখেছে সবাই তার অবয়ব বিদ্রুপ।

 

আজও সেই পথ ধরেই হেঁটে হেঁটে

দেখেছি ভাঙন—

শূন্যতায় আজ তার বুকও

আমার মতোই

এক নিষ্প্রাণ বালুচর।

 

আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছি—

কিন্তু

হয়নি তা আজ-

জনতার দৃষ্টিগোচর।।

 

৪.

আত্মমগ্নতার আত্মকথন

 

সময় গড়িয়ে গেলে অনেক কিছুই ধরা পড়ে—

কিছু বোধ জন্ম নেয়,

কিছু সহন নিজেই হয়ে ওঠে নীরব অভ্যাস।

তখন বুঝি,

আমার ‘আমি’ শেষ পর্যন্ত কারও নয়—

এ একান্তই আমার আত্মস্বত্বা।

 

মানুষ বড় ব্যস্ত—

হিসেবি জীবনের কঠিন খাঁচায় বন্দি।

জীবন নামের নাট্যমঞ্চে

সবাই অভিনয়রত,

নিরবচ্ছিন্ন অভিনয়,

মুখোশের পর মুখোশ।

টেলিভিশনের ধারাবাহিকও একদিন থামে,

কিন্তু মানুষের অভিনয় যেন থামে না

সে চলে আত্মবিস্মৃতির অসীম পর্বে।

 

হয়তো আমার এই ‘আমি’ও

কখনো কখনো হয়ে ওঠে

আত্মবৈচিত্র্যের বিস্ময়বিন্দু।

ধারালো নিয়তির ধনুকে

তাকে বারবার বিদ্ধ হতে হয়,

ক্ষত জমে আত্মমনে,

রক্তপাত হয় নীরবতায়।

তবু কী আসে যায়?

এই পৃথিবী তো নিজেই

গোলকধাঁধার অদৃশ্য অয়োময়।

 

দিনশেষে ক্লান্ত আলোর নিচে দাঁড়িয়ে

এই আমিটার পাশে থাকে কেবলই আমি।

তাই এই আমিটাকেই ভালোবাসতে হবে,

এই আমিটাকেই গড়ে তুলতে হবে আত্মযোগ্যতায়।

ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার

দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে

এই আমিটাকেই।

 

আমি চাই—

আমার আমি হয়ে উঠুক সমৃদ্ধির শিখরপ্রান্ত,

নিজের সঙ্গে নিজেই গড়ে তুলুক

আত্মবন্ধনের মৈত্রী।

এই আমি কখনো হোক

গ্রীষ্মের কালবৈশাখী—অপ্রতিরোধ্য,

কখনো বর্ষার অঝোরবৃষ্টি—প্রাণসঞ্চারী,

কখনো শরতের শুভ্র কাশবীথি,

আবার হেমন্তের সোনালি ফসলেরঘ্রাণ।

 

এই আমি কখনো হোক কুয়াশার অন্তর্লীনতা,

কখনো শীতের আশ্বাসী উষ্ণতা।

কখনো প্রত্যাশার বৃষ্টিধারা হয়ে

এই আমিটাকেই ভাসিয়ে নিয়ে যাক

সুখের নিরবচ্ছিন্ন প্লাবনে।

 

প্রভাষক সমাজকর্ম

কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ

কচুয়া, চাঁদপুর।।

 

৫.

লাল-সবুজের প্রজন্ম

 

ডিসেম্বর এলেই তরুণ প্রজন্ম বাজায় বিজয়ের ধ্বনি,

হৃদয়ে জ্বালে স্বাধীনতার দীপ, চেতনায় জাগে অগ্নি।

ভাঙে অন্ধকার, গড়ে নেয় ভোরের আলো,

সূর্যের স্বপ্ন বুকে নিয়ে নির্ভয়ে এগিয়ে চলো।

 

তোমরাই সময়ের দীপ, সাহসী দৃপ্ত ডানা,

অচেনা ভোরের মানচিত্র আঁকা,তোমাদের কল্পনা।

শহর ও গ্রাম জেগে ওঠে তোমাদের আহ্বানে,

ন্যায় আর আশার বীজ বোনা হয় প্রতিটি প্রাণে।

 

তোমরা নক্ষত্র,স্বাধীনতা পত্র আগামীর দীপ্ত ঘোষণা,

রক্তের বীজে জন্ম নেওয়া একাত্তরের প্রেরণা।

ভয় ছিল, বেদনা ছিল, ছিল শোষণের ছায়া,

বর্বরতার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল মাতৃব্যথার মায়া।

 

তবু মুক্তির ডাক দুলিয়েছিল নগর আর গ্রাম,

কবিতার পঙ্‌ক্তিতে অস্ত্র ধরেছিল রহিম আর রাম।

ত্রিশ লক্ষ প্রাণের দামে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র,

কালো রাতে আগুন জ্বেলে, লিখেছিল মুক্তির শাস্ত্র।

 

শিখেছিল সাহস, শিখেছিল ঐক্যের মন্ত্র,

ভেঙে দিয়েছিল কুটনীতি আর চক্রান্তের যন্ত্র।

বিজয়ের ধ্বনি ছড়িয়েছিল পথ-ঘাট-প্রান্তর,

লাল-সবুজে জেগে উঠেছিল স্বাধীনতার স্বাক্ষর।

 

আজ লাল-সবুজ পতাকা বিশ্বমঞ্চে হেসে কয়,

“এই ভূমি আমাদের,এই ভাষাই আমার পরিচয়।

এই অধিকার লেখা রক্তের গভীর স্রোতধারায়,

অর্জিত সাহসে, অটুট প্রত্যয়ে, সংগ্রামের ছায়ায়।”

 

গাও শহীদ-স্মরণে,বিজয়ের দীপ্ত বাংলা গান,

এই ভালোবাসায় হাসে অগণিত শহীদ ভাইয়ের প্রাণ।

নবীন প্রজন্ম, স্মরণ রেখো,পবিত্র চেতনা আজও জাগ্রত।

তোমাদেরই বুকে মুক্তিযুদ্ধ চুমুকে রয়েছে তাই সত্য।

 

তরুণেরা শোনো তোমরাই সেই রক্তিম উত্তরাধিকার,

ভালোবাসা, সাহস, ঐক্যে জেগেছে গণ অধিকার।

সবই বেঁচে আছে চেতনার দীপশিখায়,

প্রতিটি হৃদস্পন্দনে, প্রতিটি প্রত্যয়ে, প্রতিটি প্রার্থনায়।

 

৬.

নীরবতার ক্ষতচিহ্ন

 

নগর-নিঃশ্বাসের উপর হঠাৎ ছিঁড়ে গেল নীরবতার আবরণ,

এক মুহূর্তে স্থবির হলো চলমান সময়—

ধাতব এক সংকেত ভেদ করল মাংস,

আর আকাশ নির্বাক হয়েও শিখে নিল শোকের ভাষা।

 

দৃষ্টির পর্দায় দৃশ্যটি অবোধ্য, নিরুচ্চার,

কিন্তু অন্তর্লোকে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে

এক অশব্দ আর্তনাদ—

এ কি নিছক নৃশংসতার প্রদর্শনী,

নাকি ন্যায়ের প্রকাশ্য সমাধিফলক?

 

ছদ্মবেশী ছায়ারা শহরটাকে গিলতে থাকে ধীরে,

সত্যের বাক্যরাশি পদদলিত হয়ে পড়ে থাকে ধুলোমাটিতে।

কেউ প্রশ্ন তোলে না—

কোন অপরাধে উজাড় হলো লাল রক্ত?

দায়িত্বহীন সময়ের আদালতে

বিচার আজ অনুপস্থিত সাক্ষী।

 

রক্তের ঢেউয়ে ভেসে যায় অলিগলি, চত্বর,

একটি অব্যক্ত চিৎকার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে—

সে চিৎকার কোনো একক মানুষের নয়,

সে আমাদের সম্মিলিত বিবেকের হাহাকার,

মানবিক অস্তিত্বের ক্ষতবিক্ষত স্বীকারোক্তি।

 

আকাশ স্তব্ধ, ভূমি নির্বাক—

তবু প্রতিটি চক্ষে সঞ্চিত অগ্নির দাহ।

আমরা উচ্চারণ করব, আমরা উচ্চকণ্ঠ হব—

নীরব রক্তের সামনে এই প্রতিবাদ অবিনশ্বর।

 

গুলি দেহ থামাতে পারে,

সময় থামাতে পারে না চেতনার গতি।

অন্যায় যেখানে মাথা তোলে,

সেখানে আমরা উপস্থিত থাকব-

একটি মাত্র ভাষায়, একটিমাত্র প্রতিজ্ঞায়—

 

প্রতিবাদ।

প্রতিবাদ।

এবং অবিরাম প্রতিবাদ।

 

৭.

শব্দেরা ঘুমালে যে কথা জাগে

 

যে ইচ্ছেগুলো দূর থেকে ডাকত একদিন,

আজ তারা থেমে— পথের ধারে নীরব ঋণ।

সময় নামের দীর্ঘ রুক্ষ পথে বসে,

ক্লান্তির হিসাব গোনে চুপচাপ চোখ বুজে।

 

মনখারাপ আজ আর চেঁচায় না জোরে,

ভদ্রতা শিখেছে— বসে থাকে ভেতর ভরে।

হৃদয়ের কোণে একখানা নীরব চেয়ার,

ভারী হয়ে থাকে, শব্দহীন অন্তরজ্বালার।

 

হাসির আড়ালে জমে ফাটলের গল্প,

আলো কম রাখা— তাই সত্যটা অল্প।

কেউ দেখে না, কেউ খোঁজও নেয় না,

চুপচাপ রাত পেরোয় জানা-অজানা।

 

রাত গভীর হলে শব্দেরা ঘুমায়,

নিশ্বাস তখনই অর্থ খুঁজে পায়।

লম্বা, ধীর, ব্যথাভেজা শ্বাসের সারি—

না-বলা কথার আবৃত্তি, নীরব ডায়েরি।

 

৮.

দ্বিচারিতার মহড়া 

 

এই সমাজে তুমি উদ্ভট

সত্য বলবে যখন,

অন্যায় করে উল্টো বলে

কাজটা করলাম কখন?

 

হাসবে লোকে তোমায় নিয়ে

যদি শুদ্ধ শুনাও,

কপটতায় জব্দ করে

হয়ে যায় যে উধাও।

 

অবৈধ কে বৈধ করার

চলে নানান যুক্তি,

স্বার্থ উদ্ধার করতে তাঁরা

করে গুপ্ত চুক্তি।

 

যেথায় তাকাই সেথায় দেখি

প্রবঞ্চনায় ঢাকা,

বহুরূপী নীল নকশায় যে

মুখোশের রূপ আঁকা।

 

মেকি দৃশ্যে চারদিক ভরা

শিষ্ট হলো অচল,

বল প্রয়োগে ন্যায়পরতা

পরলো লোহার শিকল।

 

স্বার্থলোভী হয় যে বেজার

মুক্তকণ্ঠ শুনে,

বিপরীত মুখ করে তাঁরা

সূক্ষ্ম জাল যে বুনে।

 

বিশ্বাস আজকাল খুবই জীর্ণ

দ্বিচারিতার মধ্যে,

দুষ্ট ভাইরাস করছে গ্রাস

প্রভাত থেকে সন্ধ্যে।

 

কথায় মধু প্রাণের বন্ধু

খাতির বড়ই আহা!

গলাগলি ভালবাসা

শুধুই মিছা ডাহা।

 

৯.

একটি শব্দের বিচার 

 

সরি—

এক ফোঁটা ধ্বনি,

তবু তার ভেতর ঘনীভূত

অসংখ্য অশ্রুর ব্যাকরণ।

 

সরি—

কখনো ঠোঁটের প্রান্তে

নরম আলোর জন্ম দেয়,

কখনো বুকের অন্ধকারে

নীরব বজ্রপাত নামে।

 

ঠিক সময়ে বলা সরি

ভাঙা সন্ধ্যায়,

ফিরিয়ে আনে সকাল,

আর দেরিতে উচ্চারিত সরি

বাতাসে ঝুলে থাকা

একটি অচল অজুহাত।

 

সরি—

কখনো সেতুর নাম,

কখনো বিচ্ছেদের মানচিত্র,

এক উচ্চারণে

দুটি হৃদয়ের দূরত্ব

মুছে যায়—

অথবা চিরদিনের মতো

পরিমাপ হয়ে যায়।

 

ভুল স্বরে বলা সরি

বিশ্বাসকে করে রক্তাক্ত,

ঠিক স্বরে বলা সরি

অদৃশ্য সেলাইয়ে

জোড়া দেয় আত্মা।

 

সবচেয়ে ভয়ংকর সরি-

যেটা হয়নি বলা

নীরবতার ভেতর জমে থাকা

অব্যক্ত সরি-

সেটাই বাজিয়ে দেয়

সম্পর্কের শেষ ঘন্টা

 

সরি—

এ কোনো সাধারণ শব্দ নয়,

এ এক মুহূর্তের আদালত,

যেখানে

একটি সম্পর্ক

দোষী না মুক্ত—

রায় হয়ে যায়

এক নিঃশ্বাসেই।

 

১০.

ঘূর্ণিবায়ুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে 

 

তুমি যখনই—

কালবৈশাখীর উন্মত্ত আহ্বান,

আমার নীরব ধরণী কেঁপে ওঠে

অস্থির অনুরণনে।

 

তুমি যখনই—

নির্দয় বজ্রাঘাতের তীব্রতা,

আমি হতে চাই

প্রশান্ত, শীতল—

অবিরল জলপ্রপাত।

 

তুমি যখনই—

অদম্য, ঘন অন্ধকার মেঘমালা,

আমি উন্মোচন করি

এলোমেলো আবেগের

রঙিন কাব্যকথা।

 

তুমি যখনই—

দগ্ধ উষ্ণতায়

শত ফারেনহাইটের সীমা,

আমি তখনই—

হাওয়াই মিঠাই,

শীতল স্বপ্নের নরম ছোঁয়া।

 

তুমি যখনই—

তেজস্বী ঘূর্ণিঝড়ের অহংকার,

আমি প্রার্থনা করি

এক মুঠো

নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ধার।

 

তুমি যখনই—

রুদ্ধ দ্বার,

অনমনীয় প্রতিরোধ,

আমি নতশিরে মেনে নিই

তোমাতেই—

পরাজয়ের বোধ।

 

তুমি যখনই—

উত্তাপভরা এক উন্মত্ত নদী,

আমি খোলা চুলে

ঝাঁপ দিই—

অবাধে নিরবধি।

 

তুমি যখনই—

বৈরিতার বিবর্ণ,

ক্লান্ত সিন্ধু,

আমি হই—

অমত্ত, নির্ভীক

বৃষ্টিবিন্দু।

 

তুমি যখনই—

অশান্ত প্রবল স্রোতের ডাক,

আমি তখন

নববর্ষের পুষ্পিত বসুন্ধরা,

রঙিন পোস্টারে করি

নতুন শপথ।

 

তুমি যখনই—

ঘূর্ণিবায়ুর শনশন হাহাকার,

নব রূপে

আমি ছড়িয়ে দেই-

ভালোবাসার শিশির

সহস্রবার।

 

 

প্রভাষক সমাজকর্ম

কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ

কচুয়া, চাঁদপুর।

 

র,

অনমনীয় প্রতিরোধ,

আমি নতশিরে মেনে নিই

তোমাতেই—

পরাজয়ের বোধ।

 

তুমি যখনই—

উত্তাপভরা এক উন্মত্ত নদী,

আমি খোলা চুলে

ঝাঁপ দিই—

অবাধে নিরবধি।

 

তুমি যখনই—

বৈরিতার বিবর্ণ,

ক্লান্ত সিন্ধু,

আমি হই—

অমত্ত, নির্ভীক

বৃষ্টিবিন্দু।

 

তুমি যখনই—

অশান্ত প্রবল স্রোতের ডাক,

আমি তখন

নববর্ষের পুষ্পিত বসুন্ধরা,

রঙিন পোস্টারে করি

নতুন শপথ।

 

তুমি যখনই—

ঘূর্ণিবায়ুর শনশন হাহাকার,

নব রূপে

আমি ছড়িয়ে দেই-

ভালোবাসার শিশির

সহস্রবার।

 

 

প্রভাষক সমাজকর্ম

কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ

কচুয়া, চাঁদপুর।

জলবায়ু সহিষ্ণু মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত

মেশকাতুন নাহার’র কবিতাগুচ্ছ

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার ৪ নং সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদ হলরুমে জলবায়ু সহিষ্ণু মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ১ নভেম্বর (রবিবার) সকাল ১০টায় এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।

 

WMC কমিটির সভাপতি মো. মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ প্রশিক্ষণে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে আলোচনা পরিচালনা করেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস ও আবুল আসলাম তুহিন।

 

দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণে সাউথখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বিপুল সংখ্যক মৎস্যচাষি অংশ নেন। প্রশিক্ষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং জলবায়ু সহিষ্ণু মৎস্যচাষের বিভিন্ন ব্যবহারিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

 

বক্তারা উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকার মৎস্য খাত ঝুঁকিতে পড়ছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় চাষিদের আধুনিক কৌশলে অভ্যস্ত করা এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

 

‘ওয়েটল্যান্ড ফর রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ডরপ’ (DORP)-এর বাস্তবায়নে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সার্বিক সহযোগিতা করেন সংস্থাটির প্রতিনিধি মোঃ আব্দুল মোতালেব ও মোঃ কবির হোসেন।

‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে শরণখোলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

মেশকাতুন নাহার’র কবিতাগুচ্ছ

‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাগেরহাটের শরণখোলায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‍্যালি, আলোচনা সভা, যুব ঋণ ও যুব সংগঠনের অনুদানের চেক বিতরণ এবং গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়।

 

উপজেলা প্রশাসন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যৌথ আয়োজনে রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল ১০টায় উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে একটি যুব র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা মিলনায়তনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

 

র‍্যালি শেষে উপজেলা মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের সঞ্চালনায় এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রেজোয়ান ইফতেকারের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শিশির কুমার দাস।

 

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন পঞ্চায়েত, সাধারণ সম্পাদক বেল্লাল হোসেন মিলন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা আমীর অধ্যাপক মাওলানা রফিকুল ইসলাম কবির এবং শরণখোলা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম হোসেন সুজন।

 

আলোচনা সভা শেষে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যুব সংগঠনের মাঝে অনুদানের চেক এবং আত্মকর্মসংস্থানের জন্য যুব ঋণের চেক বিতরণ করা হয়। এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে গাছের চারা রোপণ ও সাধারণ মানুষের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

 

উক্ত অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, এনজিও প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

আকলিমা বেগমকে দিলেন ৬০ হাজার টাকা, জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে নির্মিত হলো বসতঘর

মেশকাতুন নাহার’র কবিতাগুচ্ছ

মানবিকতার টানে হাজার মাইল দূরে থেকেও নিজ এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন আমেরিকা প্রবাসী মো. আনোয়ার হোসেন। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার অসহায় বিধবা আকলিমা বেগমের দুর্দশার কথা জানতে পেরে বসতঘর নির্মাণের জন্য তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন ৬০ হাজার টাকা।

 

অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের উদ্যোগে আকলিমা বেগমের জন্য নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে নতুন বসতঘর। এতে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন অসহায় এই নারী।

 

মো. আনোয়ার হোসেন ঝিনাইগাতী উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের বনগাঁও পূর্বপাড়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মাস্টারের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও নিজের শেকড় ও এলাকার মানুষের প্রতি তাঁর টান অটুট রয়েছে। প্রবাসে থেকেও এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতায় বিভিন্ন সময় এগিয়ে এসেছেন তিনি।

 

অসহায় আকলিমা বেগমের বাড়ি উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের গোমড়া গ্রামে। জীবনের শেষ বয়সে এসে চরম অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল তাঁর। পরিবারে উপার্জনক্ষম মানুষ বলতে কার্যত কেউ নেই। দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছেন। মায়ের খোঁজখবরও তেমন নেন না। একমাত্র মেয়েটিও বিধবা। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়ের সামান্য উপার্জনেই কোনোরকমে চলে মা-মেয়ের সংসার।

 

পাশাপাশি নানা শারীরিক সমস্যায়ও জর্জরিত আকলিমা বেগম। অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ কেনা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। স্থানীয় ওষুধের দোকানে জমেছে বকেয়া। টাকা পরিশোধ করতে না পারায় একপর্যায়ে বাকিতে ওষুধ পাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়।

 

শুধু চিকিৎসার সংকটই নয়, বসবাসের ঘরটিও ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বৃষ্টি হলেই ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত। ভেঙে গিয়েছিল বেড়া, চালের টিন ও ঘরের খুঁটি। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে মা-মেয়ের বসবাস ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা আর দুর্ভোগের মধ্যেই কাটছিল তাঁদের জীবন।

 

সম্প্রতি আকলিমা বেগমের অসহায়ত্ব ও মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি আমেরিকা প্রবাসী আনোয়ার হোসেনের নজরে আসে। পরে তিনি তাঁর ছোট ভাই গোলাম রাব্বানী সোহাগের মাধ্যমে আকলিমা বেগমের খোঁজখবর নেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। বসতঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেন ৬০ হাজার টাকা।

 

এদিকে, আকলিমা বেগমের দুরবস্থার বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের মানবিক উদ্যোগে অসহায় এই পরিবারের জন্য নির্মাণ করে দেওয়া হয় একটি নতুন বসতঘর। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার সুযোগ পেয়েছেন আকলিমা বেগম ও তাঁর মেয়ে।

 

জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে বসতঘর নির্মিত হওয়ায় প্রবাসী আনোয়ার হোসেনের দেওয়া ৬০ হাজার টাকা এখন ঘর নির্মাণের পরিবর্তে আকলিমা বেগমের চিকিৎসা, ওষুধ কেনা ও অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে ব্যয় করা সম্ভব হবে। এতে তাঁর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংসারের কিছুটা আর্থিক স্বস্তি ফিরবে।

 

অসহায় মানুষের বিপদে প্রবাসে থেকেও আনোয়ার হোসেনের এমন মানবিক সহযোগিতা এবং জেলা প্রশাসকের উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে। নতুন ঘর পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে আকলিমা বেগমের জীবনে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তিনি ও তাঁর মেয়ে আনন্দিত।

×