কে এই ভয়ংকর প্রতারক সোহাগ, যেভাবে ফেলতেন ফাঁদে
আমিরুল ইসলাম (সোহাগ)-এর বিরুদ্ধে একাধিক বিয়ে, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ ও স্বর্ণালংকার গ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে আস্থা অর্জনসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার কৌশলে নিজেকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতেন সোহাগ। তার এই পরিকল্পিত কৌশল ও অভিনয়ক্ষমতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী সহজেই তার পাতানো ফাঁদে পা দিতেন। এসব অভিযোগ ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের গাড়াজান গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সোহাগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এছাড়া তার বাবা সংসদে কর্মরত এমন পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে তার বাবা মফিজ উদ্দিন একজন সাধারণ কৃষক।
ভুক্তভোগী সাদিয়া নামে এক তরুণী জানান, ইংরেজি শেখার সময় সোহাগের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা বিয়ে করেন। তবে বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, সোহাগ এর আগেও দুটি বিয়ে করেছিলেন, যা বিয়ের আগে তার কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন , আমার ছোট ভাই রিদওয়ান রিদুকে হাঙ্গেরিতে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ের কথা বলে সোহাগ নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং প্রায় এক ভরি ওজনের স্বর্ণের গলার চেইন গ্রহণ করেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ লাখ টাকা। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিদেশে পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অর্থ ও পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন , প্রেমের সম্পর্কের অভিনয় করে বিত্তশালী নারীদের টার্গেট করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। তার দাবি, গোপনে বিয়ের পর তাকে বাড়িতে নিয়ে গেলে সোহাগের মা তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
প্রতিবেশী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী দুদু মিয়া বলেন, সোহাগ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কারণে এলাকায় আলোচিত ছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, ঈদের পর সোহাগ একটি স্বর্ণের চেইন এনে তার মাকে দেন। পরে সোহাগের মা পাশের বাড়ির ঐ প্রতিবেশী স্ত্রীকে জানান, তার ছেলে এক লাখ টাকা দিয়ে চেইনটি কিনেছেন। তবে পরবর্তীতে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় প্রতারণার অভিযোগে সোহাগকে সাদিয়ার পরিবারের সদস্যরা আটক করলে, তাকে ছাড়িয়ে আনতে তার পরিবার ওই স্বর্ণের চেইন ও গরু বিক্রি করে ঢাকা টাকা পাঠায় বলে দাবী করেন দুদু মিয়া।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, টাঙ্গাইলের এক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তার ছোট ভাইকে বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন ব্যক্তি সোহাগকে খুঁজতে এলাকায় এসেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, প্রাপ্ত আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি অনুযায়ী, আমিরুল ইসলাম (সোহাগ)-এর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ফুলবাড়ীয়া থানার সিআর নং-৬৩৭/২৩ মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩০৭, ৩৭৯ ও ৩৪ ধারায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া ফুলবাড়ীয়া থানার আরও একটি মামলাসহ ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-০২-এর সিআর নং-৩০৯/২৪ মামলাতেও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তথ্য নথিতে রয়েছে। একই সঙ্গে রংপুরে সিআর নং-১২০/২৬ মামলায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ওই মামলার অভিযোগ, ধারা ও বর্তমান অবস্থাসহ বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আমিরুল ইসলাম (সোহাগ)-এর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

| ১ নভেম্বর ২০২৬













