ভারতজুড়ে বড়দিনের উৎসবে কেন আগ্রাসন চালায় হিন্দুত্ববাদীরা?
কোথাও শপিং মলের উদযাপনের আয়োজন লণ্ডভণ্ড করা হলো। কোথাও গির্জার সামনে হনুমান চালিসা পাঠ করা হলো। স্কুলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আক্রান্ত হলো। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের বা অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিরুদ্ধেই এই হামলার অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অশান্তি এবং উৎসব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আসতে থাকে। মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে দৃষ্টিহীন এক মহিলা বড়দিন উদযাপনে অংশ নিতে গিয়ে আক্রান্ত হন। স্থানীয় বিজেপির জেলা স্তরের নেত্রী অঞ্জু ভার্গভ তার উপরে হামলা চালান বলে অভিযোগ। সেই ভিডিও ভাইরাল হয় সমাজ মাধ্যমে। এর পরে নড়েচড়ে বসে বিজেপি। অঞ্জুকে সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলেছে তার দল। তিনি অবশ্য দোষ অস্বীকার করেছেন।
ওড়িশাতে সান্তা টুপি বিক্রি করার অপরাধে এক বিক্রেতাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। ‘খ্রিস্টান’ সামগ্রী কেন ‘হিন্দু’ দেশে বিক্রি হবে সেই প্রশ্ন তোলে তারা। সান্তা টুপি মাথায় দিয়েছেন বলে দিল্লির লাজপত নগরে মহিলাকে হেনস্থা করার অভিযোগ ওঠে।
কেরালার পাল্লাকড়ে ছোটদের ক্যারল অনুষ্ঠানে হামলা চালায় দুষ্কৃতিরা। অভিযোগের তির স্থানীয় আরএসএসের বিরুদ্ধে। উত্তরপ্রদেশে একাধিক গির্জার সামনে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের সদস্যরা হনুমান চালিসা পড়তে শুরু করে।
আসামে নলবাড়িতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের কর্মীরা সেন্ট মেরিজ স্কুলে ঢুকে ভাঙচুর করে। বড়দিনের আগের দিন থেকে গোটা বৃহস্পতিবার একাধিক জায়গা থেকে অনুরূপ ঘটনার খবর আসে।
এই ঘটনা প্রবাহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং একাধিক মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি পাঠায় ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স। দেশে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থনা
দেশে একাধিক জায়গায় খ্রিস্টান উৎসবের উপর যখন হামলা চলেছে তখনই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দিল্লিতে ক্যাথিড্রাল চার্চ অফ দ্য রিডেম্প্রশনে বড়দিনের প্রার্থনায় যোগ দিতে দেখা যায়। বড়দিনে সম্প্রীতির বার্তাও দেন তিনি। তবে তার আগের রাত থেকে চলা তাণ্ডব নিয়ে কিছু বলেননি তিনি।
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন?
বড়দিন ঘিরে এই অশান্তি নিয়ে কার্যত চুপ থেকেছে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি শাসিত সরকারগুলি। বিরোধীদের দাবি, সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতেই তাণ্ডব চালিয়েছে গেরুয়া শিবির। প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্যদের চুপ থাকাকে ‘লজ্জাজনক’ বলেছেন তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রীতির বার্তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
কংগ্রেস নেতা ও এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক কে সি বেনুগোপাল বলেছেন, বড়দিনে বিজেপি ঘৃণা ও বিষ উপহার দিচ্ছে। এটা সব সংখ্যালঘুর কাছে একটা বার্তা। ভারত বহুত্ববাদী দেশ, এখানে এই ঘৃণার কর্মসূচিকে কেউ সমর্থন করবে না। আপ-এর দিল্লি সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ বলেছেন, ধর্মের নামে ভারতে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।
‘অসহিষ্ণুতার নিদর্শন’
সমাজকর্মী মুদার পাথরেয়ার মতে, এই ঘটনাগুলির প্রভাব পরে অন্যান্য দেশে থাকা ভারতীয়দের উপর। ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, “অসহিষ্ণুতার যে নিদর্শন আমরা দেখছি তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একই সঙ্গে এই কথা ভুললে চলবে না, আমাদের দেশে যারা সংখ্যালঘু, পৃথিবীতে তারা সংখ্যাগুরু। অনাবাসী ভারতীয়দের উপর এই ঘটনাগুলির প্রভাব পড়তে বাধ্য। এখানে মুসলমান মানুষ আক্রান্ত হলে তার প্রভাব পড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে। ক্রিশ্চানরা আক্রান্ত হলে তার প্রভাবও পড়তে পারে ভারতীয়দের উপর। অসহিষ্ণুতায় কেউ লাভবান হয় না।”
প্রবীণ সাংবাদিক শিখা মুখোপাধ্যায় বলেন, দেশে শাসক দলের অনুপ্রেরণাতেই আজ চরমপন্থিদের ‘বাড়বাড়ন্ত’। ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, “এই ঘটনাক্রম প্রমাণ করে অসহিষ্ণুতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। দেশে মব লিঞ্চিং বাড়ছে। ক্ষমতাবানদের মদত না থাকলে এটা সম্ভব না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তারা বিজেপি ঘনিষ্ঠ কোনো না কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক শিবির। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়না।”
বড়দিন পালনে বাধার প্রসঙ্গে তিনি দেশে ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালনে বাধা দেওয়া দুষ্কৃতিদের কথা টেনে আনেন। তিনি বলেন, “আসলে এর মধ্যে একটা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষ এবং বিরোধিতা আছে। সেটা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।

| ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


















