নেকি ও পাপের পরিচয় l মুফতি নূরুল ইসলাম নাযীফ
নেকি ও পাপের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা
মানুষের জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল চাবিকাঠি হলো নেকি ও পাপের সঠিক পরিচয়। কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ— এই বোধ যদি মানুষের অন্তরে সুস্পষ্ট না থাকে, তবে তার জীবন পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। ইসলাম মানুষের সামনে নেকি ও পাপের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যাতে সে সত্যের পথে চলতে পারে এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকতে পারে।
হাদিসের আলোকে নেকির প্রকৃত সংজ্ঞা
হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাযি.) থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, আমি এক বছর ধরে মদিনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর সঙ্গে অবস্থান করি। একদিন আমি তাঁর কাছে নেকি ও গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, “নেকি হলো উত্তম চরিত্র, আর গুনাহ হলো সেই কাজ, যা করলে মানুষের অন্তরে খটকা লাগে এবং সে চায় না যে মানুষ তা জেনে ফেলুক।” – মুসলিম শরীফ , হাদিস নম্বর: ৬৫১৭
এই হাদিস আমাদের জানিয়ে দেয় যে নেকি শুধু বাহ্যিক ইবাদতের নাম নয়; বরং মানুষের চরিত্র ও অন্তরের অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শরিয়তের দৃষ্টিতে নেকি ও গুনাহের মানদণ্ড
ইসলামী শরীয়তে নেকি ও গুনাহ নির্ধারণের মূলনীতি হলো— যে কাজ আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর নির্দেশ অনুযায়ী হয়, সেটাই নেকি; আর যা এর বিরোধী হয়, সেটাই গুনাহ।
ইবাদতের মধ্যেও বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তা
যেসব কাজ নিজেই ইবাদত, সেগুলোও যদি শরীয়তের বিধানের বাইরে করা হয়, তবে তা নেকির পরিবর্তে গুনাহে পরিণত হয়। যেমন— নামাজ একটি মহান ইবাদত, কিন্তু সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়া মাকরূহ। একইভাবে রোজা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হলেও ঈদের দিন তা রাখা নিষিদ্ধ। এতে বোঝা যায়, নেকি কেবল কাজের নাম নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলাই নেকি।
উত্তম চরিত্র: ইসলামের মৌলিক শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করার শিক্ষা দিয়েছেন। উত্তম চরিত্র বা হুসনে আখলাক ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। মানুষের সঙ্গে ভদ্রতা, নম্রতা ও সদাচরণ একটি বড় নেকি।
হুসনে আখলাকের উপাদানসমূহ
আল্লামা খাজিন (রহ.) হুসনে আখলাকের উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন— মানুষের প্রতি ভালোবাসা, লেনদেনে সততা, দানশীলতা, আপন-পর নির্বিশেষে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, কৃপণতা ও লোভ পরিহার, কষ্টে ধৈর্য ধারণ এবং শালীনতা ও সম্মানের বিধান মেনে চলা।
উত্তম ও মন্দ চরিত্রের ফলাফল
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, “উত্তম চরিত্রের ফল হলো হৃদয়ের বন্ধন ও পারস্পরিক ভালোবাসা, আর মন্দ চরিত্রের ফল হলো বিচ্ছিন্নতা ও হৃদয়ের দূরত্ব।” বাস্তব জীবনেও আমরা দেখি— ভালো চরিত্র মানুষকে সম্মানিত করে, আর মন্দ চরিত্র ঘৃণিত ও একাকী করে তোলে।
নেকি মানুষের উপকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত
নেকি সেই কাজ, যার দ্বারা মানুষ ও সমাজ উপকৃত হয়। মানুষ স্বভাবগতভাবেই উপকারী কাজকে ভালোবাসে। তাই সৎকর্ম মানুষকে প্রশান্তি দেয় এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
গুনাহের অন্তরগত পরিচয় ও লজ্জাবোধ
গুনাহ এমন কাজ, যা করার পর মানুষের মনে অপরাধবোধ ও লজ্জা সৃষ্টি হয়। সে তখন নিজের কাজ গোপন করতে চায়। এই অন্তরের অস্বস্তিই গুনাহের প্রকৃত পরিচয়।
সুস্থ হৃদয় ও অসুস্থ হৃদয়ের পার্থক্য
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হৃদয়ের কথা বলেছেন, তা হলো ক্বলবে সালিম বা সুস্থ হৃদয়। অসুস্থ হৃদয় নেকি ও গুনাহের পার্থক্য বুঝতে পারে না। যেমন— অসুস্থ জিহ্বা মিষ্টিকে তিতা মনে করে, তেমনি অসুস্থ হৃদয় গুনাহকেও স্বাভাবিক মনে করে।
অভ্যাস কীভাবে গুনাহকে সহজ করে তোলে
মানুষ যখন বারবার গুনাহ করে, তখন একসময় তার বিবেক নিস্তেজ হয়ে যায়। তখন গুনাহ আর তার কাছে গুনাহ মনে হয় না। এভাবেই হৃদয় ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ঘুষের উদাহরণে গুনাহবোধের বাস্তব চিত্র
একজন ব্যক্তি, যে কখনো ঘুষ নেয়নি, তাকে জোর করে ঘুষ দিলে তার হাত কাঁপে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, কপালে ঘাম ওঠে এবং সে ভয়ে চারদিকে তাকায়। এগুলো প্রমাণ করে তার অন্তর এখনো জীবিত। কিন্তু ঘুষে অভ্যস্ত ব্যক্তি এসব কিছুই অনুভব করে না।
গুনাহ থেকে বাঁচার কার্যকর উপায়: তাওবা ও ইস্তেগফার
হৃদয় সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো— কোনো গুনাহে অভ্যস্ত না হওয়া। যদি ভুলবশত গুনাহ হয়ে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তেগফার করতে হবে।
হৃদয় সুস্থ রাখার গুরুত্ব
সুস্থ হৃদয়ই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এই হৃদয়ই নেকি ও পাপের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয় এবং মানুষকে আত্মশুদ্ধির দিকে নিয়ে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, নেকি ও পাপের প্রকৃত পরিচয় জানা এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনাই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্য। উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উত্তম চরিত্রে ভূষিত করুন, গুনাহ থেকে দূরে রাখুন এবং একটি ক্বলবে সালিম বা সুস্থ হৃদয় দান করুন। আমিন।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়াতুশ শায়খ আহমদ শফী রহ., মাটিয়াকুড়া, শ্রীবরদী, শেরপুর।

| ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


















