‘মন ছুটে যায় হারিয়াকোনায়’ – ছড়া ও কিশোর কবিতার এক মনোরম ভুবন
নূরুল ইসলাম নাযীফ রচিত ‘মন ছুটে যায় হারিয়াকোনায়’ গ্রন্থটিতে একই সঙ্গে সময়, সমাজ, প্রকৃতি, অনুভূতি ও প্রকৃত জীবনবোধ লক্ষ্য করা যায়।
বইটিতে রয়েছে শেরপুর জেলার প্রকৃতি, পর্যটন, লোকজ আবহ, প্রভু-বন্দনা এবং শৈশব, কৈশোর ও সমসাময়িক দুরন্তপনায় ভরা নানা স্মৃতি ও ছন্দের মাধুর্য। গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- লেখক স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও পরিচিত পরিবেশকে ছড়ার বিষয়বস্তু করেছেন।
হারিয়াকোনা, পাহাড়-প্রকৃতি, মাঠ, গ্রামীণ জীবন ও মনের কৌতূহল- ছড়াগুলোকে প্রাণবন্ত করেছে। বইটি পড়লে শুধু ছড়া পড়া হয় না, বরং শৈশবের চিরচেনা পথে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি আসে।
কবি তাঁর এই বইয়ের প্রথম ছড়ায় মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। পাহাড়, সাগর, আকাশ ও রাত্রির বিশালতা মেপে এগুলোর স্রষ্টা যে কত মহান, তা ছড়ার ছন্দে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
হারিয়াকোনার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর স্মৃতির বর্ণনা করতে গিয়ে কবি বলেছেন-
“মনকে তখন যায় কি বোঝানো
দূরে কোথাও থাকি!
সত্যি বলছি মনটা আমার
যায় হয়ে এক পাখি।”
‘আমার জেলা’ নামক কবিতায় কবি শেরপুর জেলার সকল পর্যটনস্থলের কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্য এক কবিতায় স্বাধীনভাবে শেখার ইচ্ছা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি বলেছেন-
“মন বলে পড়া ছেড়ে মাঠপানে ছুটি,
হেসে-খেলে সারাদিন খাই লুটোপুটি।”
গ্রন্থের নামবস্তুর কবিতায় কবি বলেছেন-
“ইট-পাথরের নগরজীবনে
নিত্য সকল ক্ষণে,
মন ছুটে যায় হারিয়াকোনায়
মায়াবী আকর্ষণে।”
বইয়ের শেষ কবিতায় আবারও হারিয়াকোনায় যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে বইটির সমাপ্তি টেনেছেন।
উল্লেখ্য, ছড়ার মূলপ্রাণ হলো ছন্দ, অন্ত্যমিল ও শ্রুতিমাধুর্য। নূরুল ইসলাম নাযীফ ছন্দের নিয়ম-নীতি মেনে সহজ ভাষায় এমনই এক ছড়ার পরিবেশ এই বইয়ে তৈরি করেছেন, যা পাঠে মনকে আনন্দ দেয় এবং মনের কৌতূহলকে জাগ্রত করে।
এই গ্রন্থটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় ইতিহাস ও পর্যটন-ভাবনার সঙ্গে শিশুসাহিত্যের সংযোগ। সাধারণত শিশুদের জন্য লেখা সাহিত্যে দূরের কল্পলোক বেশি দেখা যায়; কিন্তু এই বইয়ে নিজের এলাকার সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে সামনে আনা হয়েছে। ফলে শিশুদের মধ্যে নিজের জেলা, নিজের মাটি ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
লেখকের দৃষ্টিতে শৈশব শুধু স্মৃতি নয়- এটি আনন্দ, আবিষ্কার ও মুক্তির জগৎ। তাই বইয়ের ছড়াগুলোতে শিশুর দৌড়ঝাঁপ, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া, গ্রামীণ জীবনের সরলতা এবং হারিয়ে যাওয়া দিনের টান পাওয়া যায়।
একই সাথে কবি তাঁর সশ্রদ্ধ নিবেদনে তিন সময়ের তিনজন গুণীজনকে উপস্থাপন করেছেন- অরুণ শীল, এরশাদ জাহান ও মাহমুদ আরিফ। যাঁরা তাদের অবস্থান থেকে ছড়া-জগতকে আলোকিত করছেন। যা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে।
সাহিত্যিক মূল্যায়নের দিক থেকে বলা যায়, ‘মন ছুটে যায় হারিয়াকোনায়’ একটি আঞ্চলিক অনুভবকে সার্বজনীন আনন্দে রূপ দেওয়ার প্রয়াস। ছন্দের শৃঙ্খলা, বিষয় নির্বাচনের স্বাতন্ত্র্য এবং শেরপুরের প্রকৃতিকে সাহিত্যে তুলে ধরার কারণে গ্রন্থটি শিশু-কিশোর পাঠকদের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির অনুরাগীদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বইটি পাঠে আমি সত্যিই আনন্দিত। কবি তাঁর সৃষ্টিশীলতা এভাবেই অব্যাহত রাখুন এই কামনা।
আলোচক- আশরাফ আলী চারু

| ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬















