নূরুল ইসলাম নাযীফ ‘আত্মশুদ্ধির কবি’
আমি স্কুল জীবনে, ক্লাশ থ্রীতে পড়ার সময় থেকেই স্কুলের পাঠ্য বই পড়ার পাশাপাশি বাইরের বই পড়া শুরু করেছি। সেই কিশোর বেলায় থাকতেই আমার প্রচুর বই পড়া শেষ হয়ে গেছে।
ছোটোবেলায় আমাকে বই কিনে কিনে পড়তে হতো না। আমাদের ঘরেই ছিলো অসংখ্য বই। সেগুলিই পড়তাম মনোযোগ দিয়ে।
ক্লাশ ফাইভ শেষ করে যখন হাই স্কুলে ক্লাশ সিক্সে ভর্তি হলাম তখন পেয়ে গেলাম বিপুল বইয়ের সমাহার স্কুলের সমৃদ্ধ লাইব্রেরি।
হাই স্কুলে গিয়ে হাতে পেলাম কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভৃতি লেখকের কারো কারো কিছু বই এবং কারো কারো সমস্ত বই।
এই সব বই পড়তে পড়তে আমার মনে একটা ধারণার জন্ম হলো যে, আমাদের দেশের আলেম সমাজ কোনো সাহিত্য চর্চা করে না। কোনো সাধারণ সাহিত্যের বই লেখে না। অর্থাৎ আমাদের বাংলা ভাষার জেনারেল সাহিত্যে কোনো হযরত মাওলানার পদচারণা নাই।
আরো উপরের ক্লাশে গিয়ে পড়লাম ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ টুপি-দাড়ি ওয়ালাদের লেখা। মনে করলাম আমার ধারণা ভুল। হুজুরগণও লেখালেখি করেন। এই তো হুজুরদের দেখা পেয়ে গেলাম।
কিন্তু এদের পরিচিতি পাঠ করে জানতে পারলাম যে, এরা আলেম নন। এরা ধার্মিক। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। উচ্চ মাপের ইসলামি জ্ঞান সম্পন্ন বুদ্ধিজীবী। খাঁটি ইমানদার মানুষ। কিন্তু আলেম বা হুজুর নন।
আমার আশা ভঙ্গ হলো। আবার ভাবতে থাকলাম, তাহলে আলেমগণ সাহিত্য চর্চায় আসে না। সাহিত্য রচনায় তাদের আগ্রহ নাই। হয়তো সাহিত্য চর্চাকে তারা নিষিদ্ধ মনে করেন। কিংবা সাহিত্য চর্চাতে তারা উৎসাহ বা উদ্দম পান না।
কাজেই আমি ধরে নিলাম যে সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করা আলেমদের কাজ নয়। তাদের মূল দায়িত্ব কোরআন হাদীস নিয়ে কাজ করা। সেগুলো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা। মসজিদে ঈমামতি করা, ওয়াজ নসিহত করা।
কিন্তু আমার এই ‘ধরে নেওয়াটা’ ভুল প্রমাণিত হলো কয়েকজন আলেমের সাথে পরিচিত হয়ে এবং তাদের সাহিত্যের সন্ধান পেয়ে।
সাহিত্যচর্চা এবং সাহিত্য সংগঠন করতে এসে মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন আলেমের সাথে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা স্থাপিত হলো তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, হযরত মাওলানা মুফতি নূরুল ইসলাম নাযীফ হাফিজাহুল্লাহ।
একটা সাহিত্য সংগঠনের সভায় তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় এবং ঘনিষ্টতা। উঁচায় লম্বায় ভরাট স্বাস্থের অধিকারী, শক্তসামর্থ অমায়িক মানুষ তিনি। নিরহংকার, বিনয়ী, বুদ্ধিদীপ্ত সহজ সরল চেহারা তার।
তিনি একাধারে মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দিস, শিক্ষক, কবি, ছড়াকার, গীতিকার ও কথা সাহিত্যিক। একই সাথে অনেক গুণের অধিকারি।
মুফতি নূরুল ইসলাম নাযীফ ১৯৯০ সনের ২০ নভেম্বর শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার মাটিয়াকুড়া গ্রামের এক সবুজ শ্যামল স্নিগ্ধ পরিবেশে এবং এক ঈমানদীপ্ত শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলহাজ্ব মফিজ উদ্দীন সরকার, একজন সরকারি চাকরিজীবী এবং মাতা নূরজাহান বেগম নূরেজা একজন স্বর্ণগর্ভা ঈমানদার বুদ্ধিমতী মহিলা।
প্রকৃতির অবারিত জান্নাতি পরিবেশে, যোগ্য মায়ের সতর্ক তত্বাবধানে তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন। অতঃপর যথা সময়ে তার পড়াশোনা শুরু হয়।
তিনি কওমী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন এবং দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ইসলামি লাইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমীর আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) তার প্রত্যক্ষ উস্তাদ। তিনি তাঁর কাছে হাদিস অধ্যয়ণের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক দীক্ষাও গ্রহণ করেছেন। তার শিক্ষক ও মুর্শিদ আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) তার আধ্যাত্মিক সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, তাকে চার তরিকার বায়আত গ্রহণ করার ইজাযত প্রদান করেন।
নূরুল ইসলাম নাযীফ ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চা করে আসছেন।
তার সাহিত্যের মূল লক্ষ্যই হলো ইসলামি আমল আখলাক, আল্লাহর একত্ববাদ, এবং বৈচিত্র্যময় সৃষ্টজগতে আল্লাহর অপার মহিমাকে চিত্তাকর্ষক রূপে প্রকাশ করা।
ভাবগাম্ভীর্যময় শব্দদ্যোতনার মাধ্যমে, শিশুকিশোরসহ, সমাজের সকল স্তরের মানুষের অন্তরে জান্নাতি আলোরণ সৃষ্টি করাই তার সাহিত্যচর্চার মূল লক্ষ্য।
তিনি প্রচুর ছড়া, কবিতা এবং শিশুদের উপযোগী গল্প লিখে চলেছেন অনর্গল। তাছাড়া আরবি, ফারসি এবং উর্দু থেকে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত লেখকদের লেখা তিনি অনুবাদ করেছেন। তার লেখা গীতিকবিতা ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীদের কণ্ঠে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে তার ছড়া-কবিতা একাধিক শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যবইয়ে স্থান পেয়েছে।
তার লেখা দেশবিদেশের বিভিন্ন দৈনিক সাপ্তাহিক এবং মাসিক পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
বর্তমান পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯টি।এগুলি হলোঃ- ১) অনবদ্য ছড়াপদ্য, ২) মনের পাতায় আঁকা ছবি, ৩) চার বছরের বুড়ো, ৪) বাংলার ছড়া, ৫) রহমাতুল্লিল আলামিন, ৬) সহজ উলূমুল হাদিস,৭) আশিকের ফরিয়াদ, ৮) সাকীয়ে কাওসার এবং ৯) মন ছুটে যায় হারিয়াকোনায়।
এগুলো ছাড়া তার আরও প্রায় চল্লিশোর্ধ্ব পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত আছে।
তিনি আমাদের শেরপুরের গর্ব। আমি তার নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
নূরুল ইসলাম মনি
লেখক: কবি ও ছড়াকার।
—————————————-

| ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬














