শত্রুতা ও ভালোবাসা হোক শুধু আল্লাহর জন্য : মুফতি নূরুল ইসলাম নাযীফ
মুমিনের জীবন হলো আল্লাহমুখী জীবন। তার ভালোবাসা, ঘৃণা, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি। ইসলামে শুধু নামাজ-রোজাই নয়; বরং মানুষের সঙ্গে আচরণ, সম্পর্ক ও অনুভূতিও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রবন্ধে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও শত্রুতার গুরুত্ব, কুরআন-হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হলো।
ঈমান পূর্ণতার মানদণ্ড
হযরত আবু উমামাহ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য শত্রুতা করে, আল্লাহর জন্য দান করে এবং আল্লাহর জন্যই দান করা থেকে বিরত থাকে—সে তার ঈমানকে পূর্ণতা দান করল।” (সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিসে ঈমানের পূর্ণতার চারটি মৌলিক মানদণ্ড উল্লেখ করা হয়েছে—ভালোবাসা, শত্রুতা, দান ও দান থেকে বিরত থাকা; সবকিছুই হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
মুসলিম জীবনের মূল লক্ষ্য: আল্লাহর সন্তুষ্টি
একজন মুসলমানের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তায়ালার রেজামন্দি অর্জন করা। তাই তার প্রতিটি কথা, কাজ, আচরণ ও সিদ্ধান্তে এই চেতনা থাকা আবশ্যক—আল্লাহ কি এতে সন্তুষ্ট হবেন? যখন মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও সম্পর্ক আল্লাহর ইচ্ছার অধীন হয়ে যায়, তখনই তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করে।
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা: আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ
হযরত মু‘আয (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: “যারা আমার সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর ভালোবাসে—তাদের জন্য আমার ভালোবাসা অবধারিত।” (মিশকাতুল মাসাবীহ)
আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা মানে মূলত আল্লাহ তায়ালার মহত্ত্ব ও মর্যাদাকে সম্মান করা। এ ভালোবাসা কোনো স্বার্থ, আত্মীয়তা বা লেনদেনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং একান্তই ঈমানি সম্পর্ক।
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল
হযরত আবু যর গিফারী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো—আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা।” (মুসনাদে আহমাদ)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে ঈমান শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটতে হবে।
আল্লাহর জন্য ভালোবাসার অনন্য প্রতিদান
হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) বর্ণনা করেন—এক ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্য তার এক মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছিল। আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে তাকে জানিয়ে দেন— “আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, যেমন তুমি আল্লাহর জন্য তাকে ভালোবাসো।” (সহিহ মুসলিম)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়—আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এতটাই মূল্যবান যে, এর সংবাদ আল্লাহ নিজে ফেরেশতার মাধ্যমে পৌঁছে দেন।
দুনিয়াবি স্বার্থনির্ভর ভালোবাসার ভ্রান্তি
আজ সমাজে ভালোবাসা ও শত্রুতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে দুনিয়াবি লাভ-লোকসান। কেউ উপকার করলে সে সম্মান পায়, আর উপকারে না এলে অবহেলিত হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো—রক্তের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহায়তা বা সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে ভালোবাসা ও ঘৃণা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন, সৃষ্টিও তাকে ভালোবাসে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাঈল (আ.)-কে বলেন: আমি তাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো… অতঃপর আসমান ও জমিনবাসীর হৃদয়ে তার ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া হয়।” (সহিহ মুসলিম)
এই কারণেই আল্লাহওয়ালাদের প্রতি মানুষের হৃদয় আপনাআপনি আকৃষ্ট হয়।
কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান
হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— “কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন: কোথায় তারা, যারা আমার মহিমার কারণে পরস্পর ভালোবাসত? আজ আমি তাদের আমার আরশের ছায়ায় স্থান দেব।” (সহিহ মুসলিম)
ঈর্ষণীয় একদল মানুষ
হযরত উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
এমন কিছু বান্দা থাকবে, যারা নবী বা শহীদ নয়; কিন্তু তাদের মর্যাদা দেখে নবী ও শহীদরাও ঈর্ষা করবেন। তারা হলেন— “যারা কোনো আত্মীয়তা বা আর্থিক সম্পর্ক ছাড়াই, কেবল আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসত।” (সুনানে আবু দাউদ)
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াত তিলাওয়াত করেন—
“জেনে রেখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” (সূরা ইউনুস: ৬২)
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা ও শত্রুতা—এটাই পূর্ণ ঈমানের আলামত। যদি আমাদের সম্পর্কের মানদণ্ড আল্লাহমুখী হয়, তবে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা নিশ্চিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শত্রুতা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক পরিচিতি:
মুফতি নূরুল ইসলাম নাযীফ
কবি ও শিক্ষক।

| ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


















